মার্চের পিএমআই প্রতিবেদন

দেশের অর্থনীতির গতিকে দুর্বল করেছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট

মার্চজুড়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

উৎপাদন খাত সংকোচন ধারায় চলে গেছে। একই সঙ্গে কৃষি ও সেবা খাতের গতিও বেশ কমে গেছে। ফলে দেশের সার্বিক অর্থনীতিই দুর্বল হয়েছে।

গতকাল প্রকাশিত পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) প্রতি মাসেই যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের অর্থনীতির প্রধান চারটি খাত—কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের ওপর জরিপ চালিয়ে তৈরি করা এ প্রতিবেদনের মান ১০০-এর মধ্যে নির্ধারণ করা হয়। এতে পিএমআই মান ৫০-এর নিচে হলে দেশের অর্থনীতি সংকোচন ও ৫০-এর বেশি হলে সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে বলে বোঝানো হয়।

এক বছর ধরেই প্রতি মাসে ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পিএমআই মান। মার্চে বাংলাদেশের সামগ্রিক পিএমআই সূচক ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২ দশমিক ২ পয়েন্ট কমে ৫৩ দশমিক ৫-এ দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও গতি খুবই ধীর। সর্বশেষ এ সূচকটি মূলত কৃষি খাতে দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে প্রভাবিত হয়েছে, যেখানে উৎপাদন ও নির্মাণ—উভয় খাতেই সংকোচন দেখা গেছে। বিপরীতে সেবা খাতে তুলনামূলকভাবে কিছুটা শক্তিশালী সম্প্রসারণ দেখা গেছে।

কৃষি খাত টানা সপ্তম মাসের মতো সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে। যদিও এ মাসে গতি কিছুটা কমেছে। এ খাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও ইনপুট খরচে ধীরগতির সম্প্রসারণ দেখা গেছে। বিপরীতে অর্ডার ব্যাকলগ সূচক শক্তিশালী বৃদ্ধি প্রদর্শন করেছে। তবে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান—উভয় সূচকেই সংকোচনের দেখা মিলেছে।

টানা ১৮ মাস সম্প্রসারণের পর প্রথমবারের মতো সংকোচন ধারায় প্রবেশ করেছে উৎপাদন খাত। এ খাতের নতুন ক্রয়াদেশ, রফতানি, চূড়ান্ত পণ্য, আমদানি এবং কর্মসংস্থান সূচকের সংকোচন দেখা গেছে, যা পুরো খাতের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে কারখানায় উৎপাদন, ইনপুট ক্রয়, ইনপুট মূল্য এবং সরবরাহকারীর ডেলিভারি সূচকে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে এবং অর্ডার ব্যাকলগ সূচক আবারো সম্প্রসারণের ধারায় ফিরেছে।

নির্মাণ খাতে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সংকোচন দেখা গেছে। এছাড়া সেবা খাত টানা ১৮তম মাসের মতো সম্প্রসারণের ধারা বজায় রেখেছে এবং প্রবৃদ্ধির গতি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ খাতের নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, ইনপুট খরচ এবং অর্ডার ব্যাকলগ—সব সূচকেই সম্প্রসারণ দেখা গেছে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলোর ব্যবসায়িক পরিবেশ মিশ্র অবস্থায় রয়েছে, যেখানে রমজান ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে মৌসুমি চাহিদা কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে উচ্চ ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সেবা ও খুচরা খাতে উৎসবকালীন চাহিদার কারণে বিক্রি বাড়ার প্রত্যাশা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল, শ্রম, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফার ওপর চাপের কথা উল্লেখ করেছে। উৎপাদন ও নির্মাণ খাত দুর্বল অর্ডার প্রবাহ, বিলম্বিত বিনিয়োগ এবং সতর্ক ক্রেতা আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও ব্যবসায়িক আস্থাকে প্রভাবিত করছে।

পিএমআই প্রতিবেদন অনুসারে, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করছেন সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আগামী মাসগুলোয় ব্যবসায়িক পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘মার্চের পিএমআই সূচকগুলো ইঙ্গিত করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হচ্ছে, যা প্রধানত উৎপাদন খাতের মন্দার কারণে হয়েছে। দীর্ঘ ছুটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটজনিত বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা এ খাতে প্রভাব ফেলেছে। চলমান সংঘাতের ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে আরো দুর্বল করেছে।’ এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি আরো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আরও